বব ডিলানের ৮৫তম জন্মদিনে তাঁর বিশ্বজোড়া প্রভাব, শিলং ও কলকাতার সংগীতজগতে তাঁর উত্তরাধিকার, এবং ভারতীয় শিল্পীদের উপর তাঁর গভীর প্রভাব নিয়ে এক আবেগঘন লেখা।
মাত্র ছয় বছর বয়সে প্রথমবার শুনেছিলাম Bob Dylan-এর গান। তখন হয়তো গানের গভীরতা বোঝার বয়স ছিল না, কিন্তু তাঁর কণ্ঠে এমন এক অদ্ভুত টান ছিল যা কানে লেগে থাকত দিনের পর দিন। সময় গড়িয়েছে, জীবন পাল্টেছে, কিন্তু বব ডিলানের প্রতি সেই মুগ্ধতা আজও একটুও কমেনি। আজ ডিলানের ৮৫তম জন্মদিনে তাই এই কিংবদন্তিকে উৎসর্গ করলাম কয়েকটি কথা।
বিশ্বসঙ্গীতের ইতিহাসে বব ডিলান শুধুমাত্র একজন গায়ক নন, তিনি এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নাম। তাঁর গান সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে গেছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, অনুপ্রাণিত করেছে অসংখ্য শিল্পীকে। আশ্চর্যের বিষয়, The Beatles-এর মতো তিনি কখনও ঋষিকেশে আসেননি, ভারতের কোনও আধ্যাত্মিক গুরুর অনুসারীও হননি। তবুও ভারতে তাঁর জনপ্রিয়তা আজও অবিশ্বাস্য।
ছোটবেলার শিলং আজও আমার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করে। তখন প্রায় প্রতি বাড়িতেই কেউ না কেউ গিটার বাজাত, গান গাইত। পাহাড়ি হাওয়ায় ভেসে আসত “Mr. Tambourine Man” কিংবা “Knockin’ on Heaven’s Door”-এর সুর। সেই সুর যেন আজও আমার কানে বাজে। কৈশোরে আমি সরাসরি দেখেছি Lou Majaw-এর পারফরম্যান্স, যিনি “ভারতের বব ডিলান” নামেই পরিচিত। শিলংয়ের মানুষের কাছে ডিলান শুধুই একজন বিদেশি শিল্পী নন, তিনি এক আবেগ, এক জীবনদর্শন।
২০০৭ সালে সেই আবেগ যেন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। শিলংয়ের পোলো গ্রাউন্ডে একসঙ্গে ১,৭৩০ জন গিটারিস্ট “Knockin’ on Heaven’s Door” পরিবেশন করেছিলেন। সেই দৃশ্য ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। পাহাড়ি শহরের বুক জুড়ে যেন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল ডিলানের আত্মা।
শুধু শিলং নয়, কলকাতাতেও বব ডিলানের প্রভাব গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে। বাংলা গানের জগতে Kabir Suman এক অনন্য নাম। সমাজ সচেতন, প্রশ্নমুখর গানের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। সুমনের সংগীতে পশ্চিমা ও প্রাচ্যের নানা প্রভাব থাকলেও বব ডিলানের ছাপ স্পষ্ট। ডিলানের “Blowin’ in the Wind”-এর ভাবনা থেকেই তিনি লিখেছিলেন — “কতটা পথ পার হলে তবে মানুষ চেনা যায়।” আবার তাঁর বিখ্যাত গান “গানওয়ালা”-র মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় “Mr. Tambourine Man”-এর অনুপ্রেরণা।
একইভাবে Anjan Dutt-এর গানেও ডিলানের প্রভাব সুস্পষ্ট। গল্প বলার আশ্চর্য ক্ষমতা, ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতাকে মিশিয়ে দেওয়ার দক্ষতা— এই দিকগুলোতে অঞ্জন দত্ত যেন ডিলানেরই আত্মীয়। তাঁর “আলিবাবা” গানটির কথায় ও ভাবনায় ডিলানের “A Hard Rain’s A-Gonna Fall”-এর ছায়া স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়।
সুমন ও অঞ্জন— দু’জনের মধ্যেই আর একটি মিল রয়েছে, আর তা হল সমাজকে প্রশ্ন করার সাহস। অন্যায়, বৈষম্য, মানুষের জটিল অনুভূতি— সবকিছুকেই তাঁরা গানের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ঠিক যেমনটা করেছিলেন বব ডিলান। তাঁদের গান শুধুই বিনোদন নয়, বরং প্রতিবাদের ভাষা।
ডিলানের ফোক, রক ও ব্লুজের মিশ্রণ ভারতীয় সংগীতশিল্পীদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর অ্যাকুস্টিক গিটার নির্ভর সুর এবং আত্মমুখী গীতিকবিতা বহু ভারতীয় শিল্পীর কাছে এক নতুন পথ খুলে দিয়েছে। Indian Ocean, Rabbi Shergill কিংবা Prateek Kuhad-এর সংগীতে সেই প্রভাব স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তাঁরা ডিলানের ফোক-রক ঘরানাকে ভারতীয় সুরের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করেছেন এক নতুন সংগীতভাষা।
শুধু সুর নয়, ডিলানের গীতিকবিতাও ভারতীয় গীতিকারদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। জটিল আবেগ ও দর্শনকে সহজ অথচ কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ করার তাঁর ক্ষমতা বহু শিল্পীকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। Swanand Kirkire, Bonnie Chakraborty, Varun Grover কিংবা Amit Trivedi-এর কাজেও সেই প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
বব ডিলানের উত্তরাধিকার তাই কেবল পাশ্চাত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর গান, তাঁর প্রতিবাদ, তাঁর কবিতা পৃথিবীর নানা সংস্কৃতির মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর সংগীত আমাদের শিখিয়েছে প্রশ্ন করতে, ভাবতে, অনুভব করতে।
আজ তাঁর ৮৫তম জন্মদিনে তাই শুধু একজন শিল্পীকে নয়, এক যুগকে প্রণাম জানাই।
শুভ জন্মদিন, বব ডিলান। আপনার গান আজও আমাদের পথ দেখায়, আর হয়তো আগামী প্রজন্মকেও দেখিয়ে যাবে।


